পূর্ণতা

অ্যাসাইলামের দোতলা থেকে সামান্য একটু আকাশ দেখা যায় ।সেই আকাশে মেঘ জমেছে ।মেঘ দেখলেই গীতের পাগলামিটা বাড়ে।কে জানে মেঘ কী কেড়ে নেওয়ার স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় মেয়েটাকে ।নিজের চেম্বারে বসে ভাবছিলেন ডাক্তার মাইকেল ডিসুজা। পুরুলিয়ার ছোট্ট একটা গ্রাম, পাহাড়ের গায়ে ।ডাক্তার ডিসুজা প্রায় ২০ বছর আগে এখানে এসেছিলেন স্বেচ্ছানির্বাসনে।তার মত বিখ্যাত সাইক্রিয়াটিস্ট কলকাতায় প্রাকটিস করলে এতদিনে কোটিপতি হয়ে যেত ।কিন্তু তিনি এই প্রত্যন্ত গ্রামে এন. জি. ও-এর হয়ে সামান্য বেতনে জীবন কাটিয়ে দিলেন ।

কত কেস ই তো দেখলেন.. গীতের মত কাউকে দেখেন নি আগে ।বড় মায়া পড়ে গেছে মেয়েটার ওপর ।কে জানে কেন ।কিন্তু গীতকে সুস্থ করার কোন উপায় আছে কিনা সেটাই বুঝতে পারা যাচ্ছে না ।

স্টেশন থেকে এক বর্ষার রাতে গীতকে উদ্ধার করে পুলিশ ।তারপর এই অ্যাসাইলামের দোতলার কোণার ঘরটা গীতের একমাত্র ঠিকানা, সাথে পরিচয় ও ওটাই।৫মাসে কেউ খোঁজও করে নি।অথচ এই সব কেসে অতীত ইতিহাস জানাটা অত্যন্ত জরুরি ।

মলয়ের ডাকে ঘোর কাটল ডাক্তার সাহেবের ।রাত হয়ে গেছে কখন যে বুঝতেই পারেন নি ।রাতে একবার অ্যাসাইলামে ভিজিট করেন রোজ।আজ দেরি দেখে ডাকতে এসেছে মলয়, অ্যাসাইলামের কেয়ারটেকার।নাহ্ যেতে হবে – পা চালালেন ডাক্তার সাহেব ।

এভাবেই কেটে গেল ৪টে মাস ।মাঝে মাঝে অস্থির হয়ে ওঠেন ডাক্তার সাহেব – কিছুই করতে পারলেন না গীতের জন্য ।

মেয়েটাকে দেখলেই তিথির কথা মনে পড়ে যায় বারবার ।তিথি – তার প্রথম জীবনের ভালোবাসা ।সহজ সরল অপাপবিদ্ধ সে প্রেম ।শুধু তিথিরা হিন্দু, আর ডাক্তার সাহেব খ্রিস্টান – এই অপরাধে অপরাধী ছিলেন তারা সমাজের চোখে ।যদিও ডাক্তার সাহেবের জানা নেই, কি তার জাত।অনাথ আশ্রমে মানুষ – জানা নেই তার জন্ম পরিচয় ।আর আশ্রমের ফাদার বরাবর শিখিয়েছেন – মানুষের একমাত্র ধর্ম মনুষ্যত্ব ।তাই মেনে চলেছেন সারা জীবন ।তবু সেই অপরাধেই তিনি তার ভালোবাসাকে হারিয়েছেন।

তিথি বড় ভালো মেয়ে ছিল ।কখনও কোনও না পাওয়ার জন্য কোনও অভিযোগ ছিল না তার ।সমস্ত যন্ত্রণা নীরবে চোখের তারায় বয়ে নিয়ে গেছে ।তিথির বিয়ের পর দুবারমাত্র দেখেছিলেন তাকে।একবার তিথি এসেছিল তার কাছে – এক ভিক্ষা নিয়ে ।তিথির কোনো সন্তান হয় নি – অনেক ডাক্তারি পরীক্ষায় তার কোন দোষ ধরা পড়ে নি।স্বামীর কোন পরীক্ষা করা হয় নি-দোষের দায়ভার তুলে দেওয়া হয়েছে তিথির কাঁধে ।তিথি তার কাছে এসেছিল এক সন্তানের ভিক্ষা নিয়ে ।কিন্তু তিনি পারেন নি দিতে – মিথ্যা সামাজিক পাপ পুণ্যের বোধে সেদিন তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিথিকে।আর তার ৩মাস পরে তারই চেম্বারের সামনে দিয়ে তিথির শবযাত্রার সাক্ষী হয়েছিলেন তিনি ।তিথির ফুলের মত শরীরটা পুড়ে মাংসদলা হয়ে গেছিল ।সন্তান জন্ম না দিতে পারার অপরাধের এই শাস্তি দিয়েছিল তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন ।কে জানে, সেদিনের সামান্য পাপ করতে পারলে তিথিকে হয়ত ওভাবে পড়তে হত না ।

গীতের মধ্যে তিথিকে খুঁজে পান বারবার ।সেই অভিযোগহীন নীরব যন্ত্রণা কাতর চোখ ।বড় অসহায় লাগে ।

বেশ কিছু দিন ধরে নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে ।একটি কয়েক মাসের বাচ্চা উদ্ধার করে পুলিশ এখানের হোমে পাঠিয়েছে ।তার দেখাশোনা করার কাজ বড় কঠিন হয়ে পড়েছে ।এত ছোট কাউকে আগে রাখা হয় নি ।বাচ্চাটার ক’দিন ধরে জ্বর ।

হঠাৎ খবর এসেছে গীতকে পাওয়া যাচ্ছে না ।সমস্ত জায়গায় খোঁজ নিয়েও পাওয়া গেল না ।মাথায় হাত সবার ।পুলিশকে জবাব দিতে হবে। ।কী করে সম্ভব হল এত প্রোটেকশনের পরও।পাগলের মত অবস্থা সবার ।

এমন সময় মলয় খবর দিল – গীতকে পাওয়া গেছে ।সবাই মলয়ের সাথে হোমে গিয়ে দেখা গেল – গীত হোমের বারান্দার এক কোণে বাচ্চাটাকে বুকে নিয়ে পরম মমতায় আকড়ে আছে, আগলে আছে ।সবার মুখে হাসি – স্বস্তির নিঃশ্বাস ।

শুধু ডাক্তার সাহেবের চোখে জল-এ এক পরম প্রাপ্তি ।তিথিকে না দিতে পারা সন্তান যেন আজ গীতের কোলে পূর্ণতা পেল ।

Sankhasathi Pal

Sankhasathi Pal

মফস্বল শহরের মেয়ে।পড়াশোনা ইংরাজী সাহিত্য নিয়ে ।বর্তমানে মানসিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের শিক্ষাদান জন্য প্রশিক্ষণরত।ভালো লাগে গান, সাহিত্য চর্চা এবং ফটোগ্রাফি ।

More Posts

Related posts

Leave a Comment