গুহাপ্রবেশ

বাংলার আকাশে শীতকাল সমাসীন। ইতিউতি কুয়াশার কুন্ডলী আর রাস্তার ধারে আগুন জ্বালে হাত পা সেঁকে নেওয়ার দৃশ‍্য তারই ইঙ্গিতবাহী। হাওয়া মোরগেরও ঘুম ভাঙছেনা আলসেমিতে। তাই আজ পারদ পড়ল, কাল উঠবে, পরশু নামবে, কোঁকর কোঁ আওয়াজে জানতে পারছেনা কেউ। ভাদ্রের রোদে তাপ খাইয়ে, পেটের মধ‍্যে ন‍্যাপথলিন নিয়ে বসে থাকা সোয়েটার, মাফলারগুলো আলমারীর ঘুপচি কোণ ছেড়ে, গায়ে মাথায় উঠে বেশ একটা গ্রাম্ভারী লুক দিচ্ছে আজকাল। সবজি বাজার সবুজে সবুজ। প্রকৃতি হাত বাড়িয়ে সবাইকে বলছে, ‘এনজয় গুরু।’

নধরকান্তি পোদ্দার। পঁয়ত্রিশ তলা এপার্টমেন্টের টপ ফ্লোরের বাসিন্দা। অকৃতদার, বেশ একটু নিরালা নির্জনে থাকবেন বলে, এদিকটা বেছে নিয়েছেন। পাশের ফ্ল‍্যাটটার ছায়া পড়ে গরমে তেমন রোদ লাগেনা, শীতে যদিও একটু কম রোদ পাওয়া যায়। তবে গড়ের মাঠ, ভিক্টোরিয়া, আর হ‍্যানাত‍্যানা মিলিয়ে জুলিয়ে চলে যায়। এককালে বেশ উঁচু সরকারী চাকুরে ছিলেন, এখনও কেউ কেউ ভক্তি শ্রদ্ধা করে টরে। আসতে যেতে নমস্কার, হালকা গোছের হাসি। খিল্লী করার লোকেরও অভাবও নেই যদিও। আসলে, নধরকান্তি নিজেই তার নাম নিয়ে বড় সঙ্কটে। জন্মের সময় নাকি প্রায় তিন কেজি একশ ওজন নিয়ে জন্মেছিলেন এবং অন্নপ্রাশন অবধি তাতে শুধু সংযোজনই হয়েছিল। ঠাকুমা আদর করে নাম রেখেছিলেন নধরকান্তি। কিন্তু ব‍্যাস্ ঐ অবধিই। নধরকান্তির বছর পাঁচেক বয়সের সময়ে, ঠাকুমা চোখ বুঁজলেন। কিছুদিনের মধ‍্যে ঠাকুমার দুঃখে বা নিজের দুষ্টুমিতে ওজনও পড়তে লাগল ধুপধাপ করে। কিন্তু, নামখানার আর বদল হলনা। কানাছেলের নাম পদ্মলোচনের তকমা নিয়ে পাঁচফুট নয় ইঞ্চির সুদর্শন নধরকান্তি চাকরীতে ঢুকলেন, উঁচুতে  উঠলেন ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি। নিজে বহুবার চেষ্টা করেছেন এহেন কাঁটাটিকে সমূলে উৎপাটন করে জীবনটাকে গোলাপের পাপড়ির মত করে নিতে, কিন্তু চারদিন কোর্টের আশেপাশে ঘুরেটুরে সে কাজে ক্ষান্ত দিয়েছেন। সারাজীবন অকৃতদার রয়েও গেলেন এই নামের গেরোয়। পাত্রের নধরকান্তি নাম শুনে, পাত্রীর খুকখুক হাসিতে ফর্সা নধরের গাল, নাক, কান ক্রমশ গোলাপী থেকে লাল হয়ে উঠেছে বারেবার। তবু মাথায় শোলার টোপর চড়েনি। বাবার বেশ পয়সাকড়ি ছিল, তাই এখন এই টঙের মাথায় চড়ে নিভৃতে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ পড়ে দিন কাটাচ্ছেন। সাংসারিক ঝামেলাহীন, তাই বই পড়ে, ল‍্যাপটপে পুরোনো সিনেমা দেখে, ঘুরে বেড়িয়ে দিব‍্যি সময় কেটে যাচ্ছে। মনের ভেতরে একটা সুপ্ত ইচ্ছা অবশ‍্য আছে, তেমন তেমন সঙ্গীসাথী পাচ্ছেননা বলেই, সে প্রজেক্ট এখনও মায়ের পেটে। তবে নধর আশাবাদী, মিশন তার একদিন সাকসেসফুল হবেই।

লাল রঙের গাবদা খাতাটা টেবিলের একধারে সরিয়ে রেখে, নাকে নেমে আসা চশমাটাকে ঠিক করে নিল ক্ষীণকটি সামন্ত। এখন ঘড়িতে সকাল ছ’টা। গুরুপাক বাবুর এখনও কোন পাত্তা নেই, তারমানে উনি আজকেও আসবেন না। এইসব বুড়ো হাবড়াদের নিয়ে এটাই প্রবলেম, বয়স যত বাড়ে সময়, দায়িত্বজ্ঞান সম্পর্কে কেমন একটা গা ছাড়া ভাব দেখা দেয়। আচ্ছা আসবি না তো, ঠিক আছে। সময় থাকতে জানা, তবে সমস‍্যা হয়না। কিন্তু কাকস‍্য পরিবেদনা। এনার অবশ‍্য সমস‍্যা অন‍্য। স্ত্রী ফুলুরী দেবী মাঝেমাঝেই বিশেষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সংসারে স্বামী স্ত্রী ছাড়া দ্বিতীয় প্রাণী নেই, ফলে অসুখবিসুখে একে অন‍্যকে দেখতেই হয়। কিন্তু অন‍্যদিন একবার জানিয়ে দেন, আজ যে কি হল…। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই জাবদা খাতাটা ঠেলে একদিকে সরিয়ে দেয় ক্ষীণকটি। গুরুপাক বাবু নেই মানে আজ বাজারের দায়িত্ব অলিখিতভাবে তার। ‘গরিমার গন্ধমাদন’ নামক এই রেস্তরাঁয় গুরুপাক, বাজার সরকার কাম দারোয়ান কাম ঝাড়ুদার কাম আরোও অনেক কিছু। ক্ষীণকটির অবস্থাও এমন কিছু সুবিধের নয়। সাতঘাটের জল খেয়ে যখন “চাকরী চাই এখানে আয়” দের ধরে একটা চাকরী পেল তখন অত বাছাবাছির অপশন ছিলনা। ব‍্যাঙ্কে একসময় লেজার, বিল এইসব সামলাতো বলে, এখানকার মালকিন গরিমা গুণগ্রাহী ইন্টারভিউয়ের দিন ভাঁটার গুলির মত চোখ তুলে বলেছিল,

“তুমি বরং একাউন্টস্ টা দেখ।”

তারপর থেকে দিন আনা দিন খাওয়া শুরু। ইন্টারভিউ সেশনে ক্ষীণকটির যদিও গরিমা গুণগ্রাহীকে ভীষণ পরিচিত মনে হচ্ছিল, তবে কোথাও একটা কিন্তু ছিল। ধোঁঁয়াশা কেটেছে অচিরেই। একটা সময়ে এই ‘গরিমার গেরস্থালি’র অন‍্য একটা ব্রাঞ্চে ‘পান্তাভাতের পাতুরী’ খেয়ে রেস্তরাঁর মধ‍্যেই ওয়াক করে এক বিতিকিচ্ছিরি কান্ড বাাধিয়েছিল ক্ষীণকটি। তারপর পুরো একঘন্টা ধরে রেস্তরাঁর সমস্ত স্টাফদের ব‍্যবসার রুলস্ এন্ড রেগুলেশনস্  নিয়ে ঝাড়া জ্ঞান দিয়েছিল। শেষমেশ প্রিপেড সাড়ে তিন হাজার টাকার, গোটাটা ফেরৎ দিয়ে রেস্তরাঁ কতৃপক্ষ সে যাত্রা রক্ষা পেয়েছিল। নিজের দেড়মণি চেহারা নিয়ে, সেদিন ক্ষীঢকটির রেস্তরাঁত‍্যাগকে অনায়াসে মহাভিনিষ্ক্রমণ বলা যেতেই পারত। কিন্তু ফেঁসে গেল এখানে এসে। হঠাৎ করে বদলীর কারণে, পকেটে তেমন টাকা পয়সা ছিলনা। এ চত্বরে আবার পয়সা ফেক তামাশা দেখ্ সিস্টেম। তাই সাত তাড়াতাড়ি একটা চাকরী যোগাড় করতে হয়েছে। এবং যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ‍্যা হয় কেস খেয়ে বসেছে ক্ষীণকটি। রেস্তরাঁর মালকিন সেদিনের সে অপমানের বদলা এখন ‘চুন চুন কে’ নিচ্ছে। আজীবন ভেতো, এবং তেলেভাজা খেকো ক্ষীণকটির ডায়েটে এখন ব্রকোলি, লেটুস পাতা, গাজর সেদ্ধ, বকচয়, পালংস‍্যুপ এইসব, সাথে অবশ‍্যই নুন মরিচের তড়কা দেওয়া। দ্বিতীয় অপশন অবশ‍্য ছিল। ক্ষীণকটি নাম বদলে মেদুলা সামন্ত হয়ে যাওয়া। কিন্তু পিতৃদত্ত নাম বদলের চেয়ে নিজের স্বাদ বজল অনেক সহজ মনে হয়েছে ক্ষীণকটির । ফলে দেড়মণির ক্ষীণকটি এখন তোবড়ানো গাল, আর বাইশ ইঞ্চির কোমর নিয়ে সত‍্যিই সাইজ জিরো। এইতো, সেদিন নায়িকা ‘লস‍্যিকা অরোরা’ খেতে এসেছিলেন রেস্তরাঁয়। যাবার সময় স্লিভলেস কুর্তি পরা ক্ষীণকটিকে গাল টিপে বলে গেলেন,

” হে ডার্লো, রিয়েলি ইউ হ‍্যাভ এ সেক্সি ফিগার”

ক্ষীণকটি তো লজ্জায় অধোবদন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরের দিন থেকে এই হাড় কাঁপানো শীতেও তাকে হল্টার নেক জামাকাপড় পরে আসতে হচ্ছে মালকিনের ইচ্ছা অনুযায়ী। এই যে গুরুপাক বাবু আজ এলেন না, এই গলা কাটা, পীঠ ছেঁড়া জামা পরেই এখন তাকে দৌড়তে হবে বাজার। গরিমার গন্ধমাদনের এসাইন্ড ডিশ, ‘দারুচিনি-ছাগ দুধের ক্ষীর’ বানাতে দুধ লাগবেই লাগবে, তাও খাঁটি কালো ছাগলের দুধ। দুধের হাল হদিশ গুরুপাক বাবুর কল‍্যাণে জানা আছে, তবু এই শীতে বাজারে যাওয়া , ভাবলেই ভয় করে। বেছে বেছে চার পাঁচখানা দু অক্ষর চার অক্ষর নিজের মনে গজগজ করেই, বাজারের ঝোলা হাতে বেরোল ক্ষীণকটি। কপালে গেরো থাকলে খন্ডাবে কে?

স্বপাক ব‍্যঞ্জনে অভ‍্যস্ত নধরকান্তি। একার জন‍্য কতই বা আর লাগে। তবু মাছ, ভাল চাল আর চায়ের ব‍্যাপারে খুঁতখুঁতানিটা রয়েই গেছে। বাজারে চেনা চালওয়ালা খগেন আছে। মাসকাবারীর চালটা একেবারেই কিনে নেন, কিন্তু সে ব‍্যাটা এবার ঝুলিয়েছে। বাসমতীতে বাসনাই সুন্দর হয়, তবে বড্ড বড়লোক বড়লোক গন্ধ। আর খেয়েও কেমন ভরিয়াও না রহিল ভরা টাইপ হয়ে থাকে। তো এক’দিন ঐ বাসমতীতেই জোড়াতাপ্পি দিয়ে চালিয়েছেন, তবে আর নয়। আজ একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বেন। তিনি প্রতি মাসে তুলাইপাঞ্জি কেনেন কড়কড়ে নগদে। খগেনের কাছে, তুলাইপাঞ্জি না থাকলে বাজারে আরোও চালওয়ালা আছে, তাদের কারোর সাথেই কোয়াটার্লি পেমেন্টে রফা করবেন।

এইসব, এধার ওধার ভাবতে ভাবতে ঢুকে পড়লেন বাজারে। এমনিতেই তিনি শান্তিপ্রিয়, চিৎকার চেঁচামেচি এড়িয়ে চলেন। কিন্তু এই বাজার আর ঐ ছাতার মাঠগুলোতে এখন এত হাঁউমাঁউ হাঁউমাঁউ হয়না, বিরক্তিকর একেবারে। আর তার ওপরে এখন শীতকাল। সব ব‍্যাটারা বাড়িতে মূলো খায় আর বাজারে হাটে এয়ার পলিউট করে। নিতান্ত নিরুপায় হয়েই আজ…।

কিন্তু ও কি, খগেন চালওয়ালার সামনে দাঁড়িয়ে উনি কে? নিজের চোখদুটোকে আবার রগড়ে নিলেন নধর। নাহহ্ কোন ভুল নেই, সেইই। তবে এ তল্লাটে কবে এল, সে বিষয়ে নধরের কোন স্পষ্ট ধারণা নেই। খবরের কাগজ আর টিভি খুললেই শুধু খুনোখুনি রাহাজানি, ধর্ষণ, এই খবর দেখতে দেখতে ক্লান্ত নধর বেশ কিছুদিন যাবৎ সংবাদবিমুখ। ফলত, এত বড় সংবাদ কানে আসেনি। তবে কিনা, এই শীতেও এঁকে দেখে নধর নিজেই নিজের ‘ধক ধক করনে লাগা’ দিলের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছেন বেশ, আবার একটু ফিলিং হট্ মনে হচ্ছে।

লিপিকা কনকন, ঢালিউডি নায়িকা। মরাল গ্রীবা, আর বিলোলকটাক্ষ মেলে তাকালেন চালের দোকানে আসা, নতুন খদ্দেরের দিকে। ঐ টোল পরা হাসির ছবি বুকে নিয়ে কত রাত নধর নির্ঘুম কাটিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। অবশেষে আজকে চক্ষু কর্ণের বিবাদভঞ্জন। ভদ্রমহিলা আদতে দক্ষিণ ভারতীয়। ধোসা, ইডলিতে অভ‍্যস্ত, এতদিন ফিগার মেন্টেইনের চক্করে, স‍্যুপ, স‍্যালাড দিয়ে জীবননির্বাহ করেছেন। এখন সে রামও নেই, সে লঙ্কাও নেই। ফলে, চালের দোকানে এসেছেন সওদা করতে। খগেন ব‍্যাটা কাঠ বাঙাল, হিন্দী ইংরাজী তার চলেনা। সে শুধু হাঁ করে একবার নায়িকাকে একবার তার দৌলতে জমা ভিড়কে দেখছিল। নধরের বড় ফিল্মের শখ ছিল। অবশ‍্য চেহারাও তার তেমনই খোলতাই। কয়েকবার স্টুডিওপাড়ায় ঘোযাঘুরিও করেছেন। কিন্তু শেষ অবধি হিরোয়িনের গোঁফ লাগানো বাঘু দাদার রোল পেয়েছিলেন একবার। কোথায় ইচ্ছে ছিল, শ্রীকান্তর মত বাঁধনছাড়া প্রেম করবেন তার জায়গায় সিল্কের ড্রেসিং গাউন পরা রাগী দাদা। দূর দূর্। আর ও পথ মাড়াননি। তবে আজ যখন চান্স পেয়েছেন, একবার হীরের রাঞ্ঝা হতে বড় সাধ জাগে। চোস্ত ইংরাজীতে খগেনের বেস্ট চাল কিনিয়ে যখন ঝোলা তুলে দিলেন নায়িকার হাতে, আহাহা, সেই চাঁপার কলির মত আঙুলের ছোঁয়া এই  প্রৌঢ় বয়সেও সারা শরীরে শিহরণ জাগাল। তৎদন্ডেই নধর সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনিও এবার “নো স্নান ডিসেম্বর” চ‍্যালেঞ্জ নেবেন।

বাজারের আরেক মাথায় তখন হুলুস্থুলুস কান্ড। ধুম্রলোচনা দেবী এ বাজারের নতুন খদ্দের। কন‍্যার নাম ধুম্রলোচনা রেখে পিতা কন‍্যার মাতুলকূলের মঙ্গোলিয়ান পরিচয়টুকু সবটা মুছে দিতে চাইলেও ধুম্রলোচনা সেই ক্ষুদে চোখী ই হয়ে রইল সারাজীবন। ট্রান্সফার হয়ে যখন এদিকে এল, তখন এখানে থাকা খাওয়ার খুব ক্রাইসিস। কোন রকমে একটা ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে নিজের হোম ডেলিভারীর ব‍্যবসা শুরু করেছিল লোচু অর্থাৎ ধুম্রলোচনা। কিন্তু তার পপুলারিটি কিছুদিনের মধ‍্যে এমন বেড়ে গেল, যে হেল্পার রাখতে হল। অবশ‍্য তারাও মাঝে মধ‍্যেই বদলি হয়। এই তো গেল মাসেই এক উড়ে কে স্রেফ তাড়িয়ে দিয়েছে, কারণ কুমড়োর ছক্কায় কালো ছোলার বদলে কাবলে ছোলা দিয়ে রান্না করে দিয়েছিল। রান্না নিয়ে, ধুম্রলোচনার কোন রকম বেয়াদপি না পসন্দ। গত হপ্তায় গাজরের হালুয়া করবে বলে কেজি দশেক দিল্লীর গাজর কিনে নিয়ে গেছিল। বেশ লালচে সরেস গাজর। প্রচুর অবাঙালী কাস্টমার আছে, তারা শীতকাল এলেই হালুয়ার জন‍্য, ডেলিভারীর হালুয়া টাইট  করে দেয়, তাই এই ব‍্যবস্থা। তা গতকাল সে হালুয়া বানাতে গিয়ে দেখা যায়, বেকার দরকচা গাজর। ঘি, গাজর, জ্বালানী সময় সব স্রেফ বরবাদ। তাই ধুম্রলোচনা আজ নিজে বাজারে এসেছে, উদ্দেশ্য বাজারীকে একটু টাইট দেওয়া।

বিহারী বাজারী সবে সবে পসরা নিয়ে বসেছে। দশমণি চেহারার ধুম্রলোচনা এমনিতেই হাঁটাচলা করলে ভূমিকম্প হব হব দশা হয়। তা সে যখন বাজারীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল তখনই তার কাপড়ে চোপড়ে অবস্থা। তারপর শুরু হল পাতি বাংলা ঝাড়। বেশি রাগলে লোচু আবার, সবটা বাংলায় গুছিয়ে বলে উঠতে পারেনা। রাষ্ট্রভাষা এসে যায় বিলকুল,

“হামারা আঁখ দেখ কর্ তুম কিয়া বোঝতা হ‍্যায় কে হাম কম দেখতা হ‍্যায়?  জালি জিনিষ গছাতা হ‍্যায়? এটা দিল্লীকা গাজর আছে, না তোমার মাথা আছে? দাও হামার পয়সা ফেরৎ দাও”।

খদ্দেরের দশাসই চেহারা দেখে আর বাজখাঁই আওয়াজ শুনে অন‍্য বাজারীরা আর ধারেকাছে ভেড়েনি। গাজরওয়ালা কোন ক্রমে গেঁজের থেকে টাকা পয়সা বের করে, সেদিনের মত দোকানের ঝাঁপ ফেলে দেয়। বিজয় গরবে গরবিনী ধুম্রলোচনা অতঃপর পদদর্পে বাজারের ধুলো উড়িয়ে, এককাপ  ধোঁয়া ওঠা চায়ের জন‍্য রওনা দেয়।

“ও বদ্দা, বদ্দা” ধোঁয়া ওঠা চায়ে সবে দুটো ঢোঁক দিয়েছেন, এই হট্টমেলার মধ‍্যে এই কাংস‍্যনিন্দিত কন্ঠের আওয়াজে বিষম খেলেন নধরকান্তি। খ‍্যাকখ‍্যাকখ‍্যাক। এ তো, লোচু অর্থাৎ ধুম্রলোচনার গলা, চিনতে ভুল হবার কথা নয়। কিন্তু, শেষ অবধি এই ছোট বোনটাও এখানে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়না। অবশ‍্য আজ সকাল থেকে যা সব ভানুমতীর খেল দেখছেন, তাতে বিশ্বাস না হবারও কিছু নেই। লিপিকাকে চালের বাজারে দস্তুরমত উদ্ধার করে, গিয়েছিলেন মাছ বাজারে। শীতে বেশ সরেস শোল মাছ যদি একটা দুটো পাওয়া যায়। তা সেখানে গিয়ে আর এক গল্প। একটা পুঁচকে মত মেয়েকে তপসে মাছের দোকানের সামনে লাইন দিতে দেখে ভ্রুটা কুঁচকে গেছিল। আসলে বিরাশী কেজিকে যদি হঠাৎ বিয়াল্লিশের অবতারে দেখা যায় চিনে নিতে কষ্ট হয় বইকি! তবে ঘনঘন নাকে নেমে আসা বিড়ালচোখো চশমাকে ঠিক করার চেষ্টাই চিনিয়ে দিয়েছিল ক্ষীণকটিকে। এই তিন চরিত্র একে অপরের দীর্ঘ ও সুপরিচিত। কত শীতার্ত রাত, এবং রোদেলা দিন তিন ভাইবোনে শুধু গল্প করেই কাটিয়েছেন। রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও, ভালবাসা যে বেঁধে রাখতে পারে, তার উদাহরণ দেওয়া হত একটা সময় এদের দেখিয়ে। তারপর সেই এক্সিডেন্ট! আর কিছু মনে পড়েনা নধরের।

পঁয়ত্রিশ তলার ছাদে আড্ডা বসেছে, সন্ধ‍্যেবেলায়। একটু তাড়াতাড়ি পরপারে আসার টিকিট কাটার সুবাদে, নধরকান্তি এই এপার্টমেন্টে জায়গা পেয়েছেন। নয়ত, মানুষেরা তো, বনজঙ্গল এমনভাবে নষ্ট করা শুরু করেছে, যে গাছের ডালে ঝুলে থাকার উপায় নেই ভূতপ্রেত ব্রহ্মদত‍্যিদের। ফলত, এই ছাদগুলোই ভরসা। আবার গেরোও আছে। বনজঙ্গল নষ্ট করে নিজেরাই সব পিকনিক স্পট নষ্ট করছে।কিন্তু মনে ফুর্তি প্রচুর, আর পকেটে রেস্তর অভাব নেই। ফলে, প্রায় ফী হপ্তায় শনি রবিবারগুলো রাতে ছাদেই মোচ্ছব বসে, তখন দুকান বন্ধ করে কালা সেজে থাকা ছাড়া উপায় থাকেনা। তারপর, তারা গোটা ছাদে এঁটোকাটা ছড়িয়ে নোংরা করে চলে যায়। অন‍্যদের যে থাকতে অসুবিধা হয়, সে ব‍্যাপারে এরা বরাবরই লিস্ট বদারড্। কোন রকমে রাত্রিটুকু কাটিয়েই নধর সকালে বেরিয়ে যান গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে। বিল্ডিং কমিটির হুঁড়কোর চাপে সকালবেলাতে মেথর দিয়ে ছাদ ধুইয়ে যায় রাতের পিকনিক পার্টি। তাও চারিদিকে আঁশটে গন্ধ রয়েই যায়, বহুক্ষণ। অভিজাত এপার্টমেন্টের বাসিন্দা বলে, নধরকান্তির তবু পরিস্কারের সুবিধে আছে লোচুদের তো, তিনতলার ছাত নিজেদেরই জলঝাড়ু দিতে হয়। ক্ষীণকটি, যার চলতি নাম কুটলে তার অবস্থা আরও সঙ্গীন। ভুতুড়ে রেস্তরাঁর সিঁড়ির ল‍্যান্ডিং এর ঘরে, কোনরকমে শুয়ে থাকে। থাকার জায়গার অভাব দিন দিন ভূত সমাজেও প্রকট হয়ে উঠছে।

সামনে স্তূপীকৃত তেলেভাজা। চপ, সিঙারা, ফুলুরি, বেগুনী কি নেই। ক্ষীণকটি আজ বহুদিন পরে, প্রাণ ভরে তেলেভাজা খাচ্ছে। সকালে গল্প করে রেস্তরাঁয় ফিরতে দেরী হয়েছিল। গরিমা গুণগ্রাহী তাই ভাল মত কড়কেছে। ক্ষীণকটি তথা কুটলের চোখের আর নাকের জল, তেলেভাজার ঝালে, না দুঃখে বোঝা যাচ্ছেনা। অবশ‍্য লোচু আশ্বস্ত করেছে, গুণগ্রাহী বেশি ফ‍্যাঁচফ‍্যাঁচ করলে, “খাটো খাও বাওয়াল করোনা” সমিতির সেক্রেটারি সাঁড়াশি পাকড়াশি কে দিয়ে বেশ করে কড়কানি দিয়ে দেবে। দাদার সাথে আবার ওর বড্ড খাতির কিনা! বৌদি গোঁসাঘরে খিল দিলে, লোচুই খাবারদাবার সাপ্লাই করে।

নধরকান্তি নিয়ে বসেছেন ফিস ফিংগারের রাশি। সবই লোচুর নিজের হাতে বানানো। বহুদিন পর আপনজনকে নিজের হাতে রেঁধে খাওয়ানোর খুশি উপছে পড়ছে ধুম্রলোচনার চোখেমুখে। নধর তণ্ময় হয়ে চিবোচ্ছেন, আম কাসুন্দীর এমন গন্ধ, আহাহা! শালারা যে ফ্রাইয়ের সাথে ঐ লালচে সস্ দেয়, কে জানে! ফেসবুক নামক এক বেবাক ফাঁকা দুনিয়ার থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে পাওয়া মণিমাণিক‍্য এরা।

চাকরীর শেষের দিকে, নধরকান্তি গেছিলেন পুরুলিয়ায় ট্রেক করতে। ঘাম ধুলো দূষণের পৃথিবীর নীচে, নিজের জন‍্য জমান একটু আলোকে, নিজের হাতে ছুঁয়ে দেখতে। কিন্তু কোত্থেকে হড়পা বান এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছিল উনিশ জনের দলটাকে। ক্ষীণকটি বরাবরের নির্বিরোধী, নিরঅহংকার মেয়ে। বন্ধের দিন চাকরী করতে, রাস্তায় বেরিয়ে আর ফিরে আসতে পারেনি। বাবা নেই অনেকদিন হল। মা আর প্রিয় বন্ধু, তার চিনতে না পারা শরীরটাকে নিয়ে বসেছিল অনেকক্ষণ। তারপর আস্তে আস্তে দিন বয়ে গেছে। এদের মধ‍্যে সবচেয়ে মুখরা, আর ছেলেমানুষ ছিল ধুম্রলোচনা। নিজের জীবনের গোলকধাঁধায় তাল হারিয়ে কখন নতুন ব্লেডটা বাঁহাতের কবজির ওপর চালিয়ে দিয়েছিল আজ মনে পড়ে না। অতৃপ্ত আত্মা, এখনও পুর্নজীবন লাভ করতে পারেনি। কারো শরীরে বাসা বাঁধার আহ্বান পায়নি এখনও।

নধরকান্তি একটু আগে এপারে এসেছিলেন। বেঁচে থাকতেই এদের ভবিষ‍্যতের আবাস নিয়ে ব্লু প্রিন্ট রেডি ছিল। নধরকান্তি প্রায়ই বলতেন, “আমি গুহা কিনব রে, বুড়ো বয়সে তিনভাই বোন মিলে থাকব”। এদিকের হালহকিকত দেখে এসে এসেই, বেশ সস্তায় হিমালয়ে টু বি এইচ কে গুহা কিনে রেখেছিলেন। নেহাৎ যোগ‍্য সঙ্গীসাথী যোগাড় হয়নি বলে, এই টঙের মাথায় উঠে এতদিন কাটাচ্ছেন। দুটো ঘরে তিন ভাইবোনের হেসে খেলে চলে যাবে, যদ্দিন না , ওপারের ডাক পাচ্ছেন।

সামনের বৈশাখেই এদের গৃহপ্রবেশ, থুড়ি গুহাপ্রবেশ। আপনারা আসছেন তো?

Enakshi Goswami

Enakshi Goswami

আসাম প্রবাসী বাঙালিনীর লেখালেখির শুরু হঠাৎ করেই। অনুপ্রেরণা বলতে জীবনের চড়াই-উৎরাই আর কয়েকজন অনন্যসাধারণ মানুষের সঙ্গে কুড়িয়ে পাওয়া সম্পর্ক। গেরস্থালী আর এক পুত্রের জননী হওয়ার দায়িত্ব সামলে, কলম ধরে, এখন অধীর আগ্রহে পাঠকের মতামতপ্রত্যাশী।

More Posts

Related posts

Leave a Comment